
লালমনিরহাটের আদুরী বেগমের জীবন বাংলাদেশের অসংখ্য দরিদ্র নারীর নিত্যদিনের সংগ্রাম ও শক্তির প্রতিচ্ছবি। কাজের অনিশ্চয়তা, স্বল্প মজুরি এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মাঝেও পরিবারকে টিকিয়ে রাখার লড়াই ছিল তাঁর জীবনের বাস্তবতা।
স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ১৪ ও ১০ বছর বয়সী দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় নতুন লড়াই। কখনও গৃহকর্মী, কখনও কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। আয় ছিল অনিয়মিত, অনেক সময় ন্যায্য পারিশ্রমিকও মিলত না। কোনো দিন কাজ থাকত, কোনো দিন থাকত না। তবুও সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হতে দেননি। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই তাদের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যতের পথ খুলে দিতে পারে।
‘স্বপ্ন’ (SWAPNO) প্রকল্পের একটি স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদুরী নির্বাচিত হন। সেখান থেকেই তাঁর জীবনে পরিবর্তনের সূচনা। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) যৌথভাবে, সুইডেন সরকার এবং বেসরকারি খাতের অংশীদার ম্যারিকো বাংলাদেশের সহযোগিতায় ‘স্বপ্ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র নারীদের নিয়মিত কাজ, আয় এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন। প্রকল্পের আওতায় তিনি জনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত হন এবং নিয়মিত দৈনিক আয়ের সুযোগ পান। বহু বছর পর তাঁর জীবনে ফিরে আসে কিছুটা আর্থিক নিশ্চয়তা।
তবে একটি নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তাই তাঁর জীবনের একমাত্র পরিবর্তন ছিল না। একটি গোছানো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাঁকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে ‘মুষ্টি চাল’। এটি ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত একটি সমষ্টিগত সঞ্চয় উদ্যোগ। এই উদ্যোগে নারীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে সঞ্চয় করেন। পরিমাণে ছোট হলেও, সময়ের সঙ্গে সেই সঞ্চয়ই হয়ে ওঠে তাদের বড় ভরসা। বিশেষ করে যেসব নারীর পক্ষে ব্যাংক, ঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা গ্রহণ করা কঠিন, তাদের জন্য ‘মুষ্টি চাল’ নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সঞ্চয়ের একটি কার্যকর মাধ্যম তৈরি করেছে।

তাঁর কাছে ‘মুষ্টি চাল’ শুধু একটি সঞ্চয় কার্যক্রম ছিল না; এটি তাঁকে আর্থিক শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্ব শিখিয়েছে। এই ছোট ছোট সঞ্চয় দিয়েই তিনি প্রথমে কৃষি উৎপাদনে বিনিয়োগ করেন। এতে তাঁর পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা যেমন বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে আয়ের নতুন উৎস। পরে আরও এক ধাপ এগিয়ে রাস্তার পাশে একটি ছোট খাবারের দোকান ভাড়া নিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেন।
বর্তমানে তিনি প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নিজের দোকান পরিচালনা করেন। তিনি স্থানীয় মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার বিক্রি করেন। কৃষিকাজ এবং খাবারের দোকান—দুই উৎস মিলিয়ে এখন তাঁর মাসিক আয় প্রায় ১২ হাজার টাকা (প্রায় ৯৭ মার্কিন ডলার)। তিনি তাঁর নিজ এলাকার একজনকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পেরেছেন এবং তাঁর পরিবারের আরও দুই সদস্য প্রতিদিনের কাজে তাঁকে সহায়তা করেন।
এই উদ্যোগ শুধু তাঁর নিজের পরিবারের জীবনই বদলাচ্ছে না, উপকার করছে আশপাশের আরও অসংখ্য নারীর। ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পের অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা যে সবজি উৎপাদন করেন, সেগুলো বিক্রির জন্য তাঁর দোকান একটি স্থানীয় বাজার তৈরি করেছে। ফলে নারীদের মধ্যে ছোট পরিসরের অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
তাঁর জীবনের এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনও বটে। এখন তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেন, নিজের আয় নিজেই পরিচালনা করেন এবং সমাজেও আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্মানিত হন। অনিয়মিত দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল জীবন থেকে বেরিয়ে এসে তিনি এমন একটি জীবিকা গড়ে তুলেছেন, যা তাঁকে দিয়েছে আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
আদুরীর গল্প আমাদের দেখায়, ‘মুষ্টি চাল’-এর মতো ছোট সমষ্টিগত সঞ্চয় উদ্যোগও কীভাবে দরিদ্র নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। নিয়মিত আয়, সমষ্টিগত সঞ্চয় এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ একসঙ্গে তৈরি হলে নারীরাও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই জীবিকার পথ গড়ে তুলতে পারবে। তাঁর পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ছোট ছোট সঞ্চয়ও একদিন হয়ে ওঠে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি।