Posted on:
December 21, 2025

প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী অসহায় নারীরা, অনেকে উদ্যোক্তাও হচ্ছেন

Read the origial news on prothom Alo

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার সরসপুর ইউনিয়নের ভাউপুর গ্রামের বাসিন্দা শারমিন আক্তার (২৫)। গত বছরের মে মাসে তাঁর স্বামী ইসমাইল হোসেন (২৮) বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। ইসমাইল ছিলেন ভূমিহীন। তাঁরা থাকেন নিজ গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে শারমিনের দিশাহারা অবস্থা। কী করবেন, ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না। ঠিক এমন সময় তাঁর কাছে আশার আলো হয়ে এসেছে ‘স্বপ্ন প্রকল্প’। এই প্রকল্প শারমিন আক্তারকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছে।

শিল্পী রানী রবিদাসের জীবন ছিল আরও কঠিন। ছোটবেলা থেকেই অবহেলা আর কষ্টই তাঁর সঙ্গী। ১৪ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় চাঁদপুরে। স্বামী হরি রবিদাস ছিলেন ছিলেন সেলুনকর্মী। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১২ বছর আগে তিনি মারা গেছেন। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে শিল্পী বাবার বাড়ি কুমিল্লার লাকসামের বিজরা গ্রামে ফিরে আসেন। বাবা নেই; মা ও ভাইবোনেরা থাকেন শহরে। নিজ গ্রামে শিল্পীর থাকার কোনো ব্যবস্থা হলো না। বাধ্য হয়ে ছেলেমেয়েকে নিয়ে পাশের কোয়ার গ্রামে এক হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নেন তিনি। একপর্যায়ে শিল্পী পরিবারের ভরণপোষণের জন্য লোজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জুতা সেলাই শুরু করেন। এভাবেই চলেছে এক দশকের বেশি। শিল্পী রানী রবিদাসের পাশেও দাঁড়িয়েছে ‘স্বপ্ন প্রকল্প’।  

প্রকল্পটির মাধ্যমে কুমিল্লা ও চাঁদপুরের ৫টি উপজেলার ১ হাজার ৫১২ জন পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ নারীর জীবনের গতিপথ বদলাতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্রকল্পটির মাধ্যমে অনেক নারী হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তাও।

২০২৩ সালের জুলাই থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘উৎপাদনশীল ও সম্ভাবনাময় কর্মের সুযোগ গ্রহণে নারীর সামর্থ্য উন্নয়ন (স্বপ্ন-দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প’ দেশের ১২টি জেলার ২৮৩টি ইউনিয়নে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও সুইডিশ সরকারের সহযোগিতায় এতে অর্থায়ন করছে মেরিকো। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে অতিদরিদ্র নারীপ্রধান পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ১২ জেলায় পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার থেকে ৭১ কোটি ৬১ লাখ এবং দাতা সংস্থা থেকে ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা তহবিল সরবরাহ হচ্ছে।

১২টি জেলায় প্রকল্পটিতে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ১৮৮। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে কুমিল্লা জেলার লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ এবং চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর, হাইমচর ও ফরিদগঞ্জ—এই ৫ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে অতিদরিদ্র নারীপ্রধান পরিবারের পিছিয়ে পড়া নারীদের প্রকল্পের উপকারভোগী হিসেবে কয়েক ধাপে বাছাই করা হয়েছে। এই পাঁচ উপজেলার ৪২টি ইউনিয়নে ৩৬ জন করে মোট ১ হাজার ৫১২ জন নারীকে যুক্ত করা হয়েছে উপকারভোগী হিসেবে।  

ইউএনডিপির কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার ফোকালপারসন মাসুম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ৩৬ জন উপকারভোগী নারীকে খুঁজে বের করা হয়, যাঁদের মাসিক গড় আয় ৫ হাজার টাকার নিচে। এরপর প্রতিটি ইউনিয়নে থাকা আমাদের মাঠকর্মীরা শনাক্ত হওয়া নারীরা প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত কি না, সেটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করেন।’

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে অতিদরিদ্র নারীপ্রধান পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ১২ জেলায় পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার থেকে ৭১ কোটি ৬১ লাখ এবং দাতা সংস্থা থেকে ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা তহবিল সরবরাহ হচ্ছে।

কুমিল্লা শহরতলির রঘুপুর এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এইড কুমিল্লা’র ইএসডিও ট্রেনিং সেন্টার। গত ২৩ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুইং মেশিন অপারেশন–বিষয়ক আবাসিক প্রশিক্ষণ চলছে। ২৮ জন নারী৬০ দিন প্রশিক্ষণ নেবেন। ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণে এরই মধ্যে তাঁরা বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। নিজেরাই তৈরি করছেন শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের পোশাক।

প্রশিক্ষণার্থী নারীদের মধ্যে আছেন মনোহরগঞ্জ উপজেলার ভাউপুর গ্রামের সেই শারমিন আক্তার। এখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারীদের অনেকেই ছোট সন্তানকেও নিয়ে এসেছেন। আবাসনব্যবস্থার পাশাপাশি শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাও আছে এখানে।

প্রশিক্ষণের ফাঁকে শারমিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর মনে হচ্ছিল দুই সন্তানকে নিয়ে সাগরে পড়েছি। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ইউএনডিপি আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আমি এরই মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুইং মেশিনের অনেক কিছু শিখেছি। নিজেই এই মেশিন দিয়ে পোশাক তৈরি করতে পারি। আশা করছি, কিছুদিন পরেই ভালো বেতনে গার্মেন্টসে চাকরি করতে পারব।’

প্রিয়া আক্তার (২৮) চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের গজারিয়া গ্রাম থেকে এসেছেন প্রশিক্ষণ নিতে। ৪ বছর আগে স্বামী ছেড়ে গেছেন। ৬ বছরের ছেলেকে নিয়ে আছেন প্রিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামী ছাইড়া যাওনের পর পর হতাশ হইয়া গিছিলাম। এহন স্বপ্ন দেখি নিজে কিছু একটা করমু। আমি গার্মেন্টেসে কাজ কইরা পোলাডারে শিক্ষিত করতে চাই।’

মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জুতাই সেলাই করা শিল্পী রানী রবিদাস এখন নিজেই জুতা তৈরির প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। গত ২৩ নভেম্বর বিকেলে লাকসামের মুদাফ্‌ফরগঞ্জ এলাকায় একটি জুতা তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, শিল্পী রানী মনোযোগ দিয়ে কাজ শিখছেন। দুই মাসের প্রশিক্ষণ শেষে নিজেই ছোট্ট একটি জুতার দোকান দিতে চান। যেখান নিজের তৈরি জুতা বিক্রি করবেন তিনি।

প্রকল্পটির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে মনোহরগঞ্জের মৈশাতুয়া গ্রামের কোহিনুর আক্তার স্থানীয় বাজারে কাপড়ের দোকান দিয়েছেন। কোহিনুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘৫ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। এরপর খুবই অহসায় হয়ে পড়ি দুই সন্তানকে নিয়ে। সঞ্চয় ও প্রতি মাসে টাকা জমিয়ে কাপড়ের দোকান দিয়েছি। একটি সেলাই মেশিনও আছে। আমি নিজেই মানুষের জামাকাপড় সেলাই করে ভালোই আয় করছি।’

ইউএনডিপির কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েট নুসরাত মাহমুদ (অনন্যা) প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীরা ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ, ফসল ও সবজি উৎপাদন বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের অনেকে নিজ উদ্যোগে আয়মুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

Related News

Read More
Read More
Read More
Read More